নরসিংদী প্রতিনিধি:
নরসিংদীর বেলাবতে আদালতে মামলা চলমান থাকা একটি জমি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর হস্তক্ষেপ, স্থাপনা ভাঙচুর, একজনকে থানায় আটকে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাইলাতুল হোসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগী শাহিন মিয়া ও সোহেল মিয়া জানান, ধুকুন্দি এলাকায় তাদের মালিকানাধীন জমি নিয়ে আতাউর, খোদেজা বেগম, রাজীব, ফেরদৌসী, আহসান উল্লাহ ও মামুনসহ ছয়জনের সঙ্গে বিরোধ চলছে। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, নরসিংদীতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় বেলাব এম মোকদ্দমা নং-৮০৬/২০২৬ দায়ের করা হয়েছে। একই সম্পত্তি নিয়ে দেওয়ানি আদালতেও বাটোয়ারা মামলা চলমান রয়েছে বলে তারা জানান।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নালিশা ভূমিতে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বেলাব থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। আদালতের ওই নির্দেশের বিষয়টি গত ২৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়। মামলার পরবর্তী তারিখ ১ ডিসেম্বর ২০২৬ নির্ধারিত রয়েছে বলেও তারা জানান।
অভিযোগ রয়েছে, আদালতে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি জানানো সত্ত্বেও প্রতিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে তাদের ডাকা হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সেখানে শাহিন ও সোহেল উপস্থিত হয়ে দেওয়ানি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি ইউএনওকে জানান এবং আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কথা বলেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রতিপক্ষের লোকজন সোহেলকে পেছন থেকে চুল ধরে টেবিলের ওপর আঘাত করে। এতে তার মাথায় আঘাত লাগে। এরপর ইউএনওর নির্দেশে পুলিশ ডেকে সোহেলকে থানায় নিয়ে প্রায় আট ঘণ্টা আটক রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
শাহিন মিয়ার দাবি, সোহেলের দাদা মারা গেলেও তাকে জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে থানা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সোহেল জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
ঘটনার এখানেই শেষ নয়—এমন অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, একই দিন বিকেলে ইউএনওর মৌখিক নির্দেশে এসিল্যান্ড ও বেলাব থানার ওসি দুটি গাড়ি নিয়ে নালিশা ভূমিতে যান। সেখানে পুলিশ ও প্রতিপক্ষের লোকজনের উপস্থিতিতে তাদের ঘর, সীমানা পিলার ভাঙচুর এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়দের কয়েকজন ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে চাইলে পুলিশ তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দিতে লাঠিচার্জ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শাহিন মিয়ার আরও অভিযোগ, পরবর্তীতে পুলিশ তার বাড়ির গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে অসুস্থ বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তানদের সামনে তাকে নিয়ে হুমকি দেয়। বিষয়টি নিয়ে কারও কাছে অভিযোগ করলে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো কিংবা গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বেলাব থানার ওসি এসএম আমানুল্লাহ বলেন, “ইউএনওর নির্দেশে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছি। উনার নির্দেশেই স্থাপনা সরানো হয়েছে এবং উনার নির্দেশেই সোহেলকে থানায় আটক রাখা হয়েছে।”
অন্যদিকে বেলাব উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজিজ সারজাদ জায়েদ হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে বলেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তির বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা এসিল্যান্ডের নেই। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি সংশ্লিষ্টদের দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলেও জানান।
তিনি আরও বলেন, নালিশা জমিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় ইউএনও তাকে পুলিশের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। জমি সংক্রান্ত বিষয়ে ইউএনওর কাছেই জানতে চাওয়াকে সমীচীন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে পুরো ঘটনায় ইউএনও লাইলাতুল হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মামলার বাদী সোহেলকে অভিযুক্ত বলেন, কি মামলায় তাকে আটক করা হয়েছে, আদালতে বিচারাধীন জমিতে অভিযান দিতে পারেন কিনা, এসব প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি! তিনি প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর না দিয়ে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলেছেন।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—দেওয়ানি আদালত ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একই জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা কীভাবে ওই জমিতে গিয়ে স্থাপনা সরানো বা দখল পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ নিতে পারেন? তাদের দাবি, আদালতের বিচারাধীন একটি সম্পত্তি নিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এমন পদক্ষেপের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সোহেলকে আটকের বৈধতা, স্থাপনা ভাঙচুর, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, স্থানীয়দের ভিডিও ধারণে বাধা এবং বাড়িতে প্রবেশ করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এই ঘটনায় নরসিংদী প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগীরা। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং আদালতের বিচারাধীন সম্পত্তির বিষয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না—তা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন শাহিন মোল্লা ও সোহেল মিয়া।